গ্রাম বাংলার কৃষক পরিবারের একজন গৃহিনী শেফালী
আক্তার। কয়েকদিন যাবত্ তার শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। মুখে রুচি নেই, বমি বমি
ভাব, প্রস্রাব হলুদ হচ্ছে এবং চোখও হালকা হলুদ হয়ে এসেছে। শেফালী আক্তারের
স্বামী হেলাল মিয়া গ্রামের লোকজনের সাথে আলাপ করে বুঝতে পারলেন যে শেফালী
আক্তারের জন্ভিস হয়েছে। তাদেরই পরামর্শে তাকে নিয়ে গেলেন কবিরাজের কাছে।
কবিরাজ হলুদ পড়া মেখে, পানি পড়া দিয়ে ও রঙ্গিন শরবত খাইয়ে শেফালী আক্তারের
জন্ডিস দূর করার চিকিত্সা শুরু করলেন। শেফালী আক্তার সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে
আরও বেশীি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অবশেষে হেলাল মিয়া শেফালী আক্তারকে ডাক্তারের
কাছে নিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার মানুষগুলো সরল বিশ্বাস ও
অসচেতনার কারণে এখনও জন্ডিস হলে কবিরাজ-ফকিরের কাছেই প্রথমে দ্বারস্থ হন।
ফলে তাদের জন্ডিস উপসম হওয়াতো দূরের কথা, জন্ডিস কি জন্য হলো তা অনির্নীত
থেকে যায়। শুধ যে গ্রামে এরকম হয়তা নয়, শহরের অলিতে গলিতেও এরকম কিছু ভন্ড
চিকিত্সক পাওয়া যায় যারা ওষুধের নামে বিভিন্ন রং মিশ্রিত শরবত খাইয়ে, গলায়
লতার মালা পড়িয়ে, মাথায় সিঁদুড় ও পাতার বরণ দিয়ে এবং নাকে নশ্যি টানিয়ে
জন্ডিস কমানোর অপচেষ্টা চালান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস ভাল হয়ে যায় বলে
মনে হয়। প্রকৃত পক্ষে এসব ক্ষেত্রে হেপটাইটিস এ ও ই ভাইরাস দিয়ে স্বল্প
মাত্রায় লিভারের প্রদাহ হয়ে জন্ডিস হয়, যা বিশ্রামে থাকলে কিছুদিন পরে
এমনিতেই কমে

যায়। কিন্তু মাঝখান থেকে অসেচতনার কারণে উল্টোপাল্টা জিনিস
সেবনে লিভারের চাপ আরও বাড়ে। তদুপরি, জন্ডিস তথা চোখ হলুদ ও প্রস্রাব গাঢ়
হওয়ার সমস্যাটা বিভিন্ন কারণে হতে পারে।
রক্তে লোহিত কনিকার
ভিতরে থাকে হিমোগ্লোবিন, যা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন পরিবহন করে শরীরের
বিভিন্ন অংশে পরিবহন করে। লিভার মেয়াদোত্তীর্ণ হিমোগ্লোবিনকে ভেঙ্গে
বিলিরুবিন অনু তৈরী করে। উক্ত বিলিরুবিন অনু পিত্তের মধ্য দিয়ে খাদ্যনালীতে
বের হয়ে যায়। কোন কারণে রক্তে বিলিরুবিন বেশী জমা হলে চোখ হলুদ হয়ে যায়,
প্রস্রাব গাঢ় হয় এবং বেশী মাত্রায় হলে শরীরও হলুদ হয়ে পড়ে। তিন প্রক্রিয়ায়
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এক: অধিক পরিমাণে লোহিত রক্ত
কণিকা ভেঙ্গে যাওয়া, দুই: লিভারের প্রদাহের কারণে লিভার কর্তৃক বিলিরুবিনকে
পিত্তনালীতে বের করতে না পারা এবং তিন: পিত্তনালী আটকে যাওয়া। কিছু কিছু
মানুষের জেনেটিক কারণে লোহিত রক্ত কণিকা বেশী ভঙ্গুর হয়। তাদের ক্ষেত্রে
হঠাত্ রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। আবার যাদের
পিত্তনালীতে পাথর হয় তাদের পিত্তের সাথে বিলিরুবিন না বেরোতে পেরে রক্তে
বেড়ে যায়। সুতরাং যারা জন্ডিস হলে কবিরাজের দ্বারস্থ্য হয়, কিংবা গ্রাম্য
ভূয়া চিকিত্সকের স্বরণাপন্ন হয় াতদের ক্ষেত্রে জন্ডিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ
কারণ নির্ণীত না হওয়ায় পরবর্তীতে তারা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
লিভারে প্রদাহ হয় হেপাটাইটিস ভাইরাস দিয়ে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই
ভাইরাস। এর মধ্যে এ ও ই স্বল্পমেয়াদী প্রদাহ করে এবং বি ও সি দীর্ঘ মেয়াদী
প্রদাহ করে। বি ও সি ভাইরাস দিয়ে লিভার আক্রান্ত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
জন্ডিস দেখা দেয় না। তবে এরা নিরবে লিভারের ক্ষতি করে যেতে থাকে। আমাদের
দেশে অনেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য মেডিক্যাল চেক আপ করার সময় বা রক্ত দিতে
গিয়ে ব্লাড স্ক্রিনিং করার সময় ঘটনাক্রমে রক্তে বি বা সি ভাইরাসের উপস্থিতি
সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু বি ও সি ভাইরাসের রোগের ধরণ সম্পর্কে না
জানার কারণে এবং এদের চিকিত্সা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকে প্রাথমিক
অবস্থায় চিকিত্সা নেন না। ফলে এদের মধ্যে অনেকে পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস
নিয়ে ডাক্তারের স্বরণাপন্ন হন। যেমনটা ঘটেছে আব্দুল মজীদের ক্ষেত্রে।
আব্দুল মজীদ ছিলেন একজন মুদী দোকানদার। তখন তার বয় ২৫ বছর। ভালো আয় না
হওয়ায় ব্যবসা ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন। শহরে এসে মেডিকেল
চেক আপ করান। চেক আপে তার এইচবিএসএজি পজিটিভ ধরা পরে। বিদেশে যেতে পারবেন
না দেখে গ্রামে এসে পুনারায় দোকানদারীতে মনযোগ দেন। গ্রামের প্রতিবেশীদের
কথায় একজন গ্রাম্য ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেন। গ্রাম্য ডাক্তার তাকে বলেন
এটা কোন সমস্যা নয় এবং একটা ভিটামিন লিখে দেন। এই ভাবে চলতে থাকে বেশ কয়েক
বছর। এরপর তার ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়, পায়খানার অভ্যাসের অনিয়ম শুরু হয় এবং
শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। এবার তিনি একজন রেজিস্টার্ড চিকিত্সককে দেখালে
চিকিত্সক তাকে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেন। রিভার বিশেষজ্ঞ
চিকিত্সক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন আব্দুল মজীদের রক্তে ‘বি’
ভাইরাসের ডিএনএ-এর পরিমাণ অনেক বেশি এবং লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ করতে
করতে সিরোসিস করে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তাকে বলেন যে চিকিত্সা আরো আগে
শুরু করতে পারলে সিরোসিসকে হয়ত প্রতিহত করা যেতে পারতো।
দি
লিভার সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান
কারণ হলো হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস। এই ভাইরাসগুলো লিভারে দীর্ঘ মেয়াদী
প্রদাহ করে। এ অবস্থায় যদি বি এবং সি ভাইরাসের চিকিত্সা করা যায়, তাহলে
সিরোসিস প্রতিরোধ করা যেতে পারে। কিন্তু উপরোক্ত ঘটনাটির মত এখনও বাংলাদেশে
অনেক মানুষ অসচেতনতার ফলে এবং চিকিত্সক নামধারী ভন্ড চিকিত্সকদের
পরামর্শের উপর ভরসা করার কারণে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের চিকিত্সার
সুযোগ সম্পর্কে অবহিত হতে পারছেন না। ফলে তারা যথা সময়ে চিকিত্সা গ্রহণ
করছেন না এবং তারা লিভার সিরোসিসের মত কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস কর্তৃক লিভারের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহকালীন
ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, অস্থিরতা, অস্বস্থি ইত্যাদি
অনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলোকে সাধারণ ভাইরাল
জ্বর বা পুষ্টির অভাব বিবেচনা করে বি ও সি ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা করা হয়
না। এছাড়াও দারিদ্রতার কারণে অনেকে ছোটখোটো পরীক্ষানিরীক্ষাও করতে রাজী হন
না। এধরণের বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের মানুষদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বি ও
সি ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও তাদেরকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না এবং চিকিত্সা
দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দীর্ঘ মেয়াদী রোগ
করছে কিনা এবং করলে তা কি পর্যায়ে আছে তা নির্ধারণ করতে রক্তে বেশ কিছু
মার্কার ও লিভার এনজাইমের উপস্থিতি ও পরিমাণ দেখা হয়। তন্মধ্যে আছে, HBs
Ag, HBe Ag, ALT, AST ইত্যাদি। এছাড়া পিসিআর পদ্ধতিতে হেপাটাইটিস বি
ভাইরাসের ডিএনএ-এর সংখ্যাও নিরুপণ করা হয়। রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের
কার্যক্রম বেশী পাওয়া গেলে চিকিত্সা করতে হয়। এর জন্য বাজারে দু’ধরণের ওষুধ
পাওয়া যায়। ইন্টারফেরন, যা ত্বকের নিচে ইনজেক্ট করতে হয় এবং এন্টিভাইরাল
ওষুধ, যা মুখে খেতে হয়। ইন্টারফেরনের দাম বেশী হওয়ায় সবার পক্ষে তা নেয়া
সম্ভব হয় না। কিন্তু ইন্টারফেরন ব্যবহারে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ছয়মাসের মধ্যে
একটি ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে এন্টিভাইরাল ওষুধ
প্রতিদিন একটা করে দীর্ঘ দিন সেবন করতে হয়। ইন্টারফেরন বা এন্টিভাইরাল ওষুধ
যেটাই ব্যবহার করা হোক না কেন, যদি কেউ নিয়মিত ব্যবহার করে তার শরীরে
ভাইরাসের কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা সম্ভব হয়। ফলে এ প্রক্রিয়ায় লিভারের
দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালানো যায়। এমনকি লিভার
সিরোসিস হয়ে গেলেও প্রাথমিক অবস্থায় তার চিকিত্সা করা যায়, যা সমাজে
প্রচলিত ধারণার বিপরীত। উল্লেখ্য, সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো লিভার সিরোসিস
হয়ে গেলে তার কোন চিকিত্সা নেই। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে
ইন্টারফেরন নেয়ার সামর্থ সবার না থাকলেও এন্টিভাইরাল ওষুধ অনেকের পক্ষেই
সেবন করা সম্ভব। সুতরাং উক্ত রোগ ও চিকিত্সা সম্পর্কে সচেতনা বাড়লে অনেক
রোগীকেই যথা সময়ে চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হবে।
লিভার সিরোসিস বি ও
সি ভাইরাস ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন কারণে হতে পারে। পাশ্চাত্যে লিভার
সিরোসিসের প্রধান কারণ হলো অ্যালকোহল সেবন এবং ননঅ্যালকোহলিক
স্টিয়াটোহেপাটাইটিস । কিন্তু বাংলাদেশে এখনও এদুটো প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য
হওয়ার মত অবস্থায় আসেনি। অ্যালকোহলিক সিরোসিস না হওয়ার মূল কারণ ধর্মীয়
বিধিবিধান মেনে চলা এবং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা। তবে, নন
অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বাংলাদেশে যেই হারে বাড়ছে তাতে শীঘ্রই এটি
সিরোসিসের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি
লিভার ডিজিজ আমাদের দেশে লিভার রোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দি
লিভার সেন্টারের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীর লিভারে
পরিমাণের চেয়ে বেশী ফ্যাট জমা হয়েছে। বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক উন্নতি,
খাধ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, জীবনকে সহজ করে দেয়া মেশিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায়
মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমে যাচ্ছে। যার ফলে দিনকে দিন মানুষ বেশী বেশী
মুটিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে। অথচ লিভারের অতিরিক্ত ফ্যাটের
দীর্ঘকালীন উপস্থিতি যে লিভারে প্রদাহ করে সিরোসিস করতে পারে সে সম্পর্কে
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষেরই কোন ধারণা নেই।
ময়মনসিংহের
আজিজুর রহমান সাহেবেরও এ বিষয়ে কোন ধারণা ছিলো না। আজিজুর রহমান সাহেব
প্রথম যখন লিভার বিশেষজ্ঞের কাছে আসেন, তখন তার ইতোমধ্যে লিভারে
স্টিয়াটোসিস হয়ে গিয়েছে। স্টিয়াটোসিস হলো দীর্ঘ মেয়াদী অতিরিক্ত চর্বি জমা
হওয়ার ফলে সৃষ্ট প্রদাহের কারণে লিভারের গাঠনিক পরিবর্তন। দীর্ঘ মেয়াদী
প্রদাহের ফলে লিভারের কোষগুলোর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরণের তন্ত্র জমা হয়, যাকে
বলে ফাইব্রোসিস। ডাক্তার ফাইব্রোস্ক্যান করে দেখতে পেলেন যে, আজিজুর রহমান
সাহেবের লিভারে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় তন্ত দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং
তা সিরোসিসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তার রোগের লক্ষণ ও লিভারের অন্যান্য
পরীক্ষা নিরীক্ষাগলো তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজিজুর রহমান বিশেষজ্ঞের কাছ
থেকে বিষয়টি জেনে উপলব্ধি করতে পারলেন যে শরীরের চর্বি কমিয়ে রাখার গুরুত্ব
কতটুকু।
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
হলো-পেটে অতিরিক্ত মেদ তথা অবেসিটি, টাইপ২ ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিনড্রোম,
রক্তে অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল এবং হাইপো-থাইরয়ডিজম। নিয়মিত
শরীর চর্চা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, প্রয়োজন মাফিক চর্বি কমার ওষুধ সেবন
এবং চর্বি জমা হওয়ার কারণ নির্ণয়পূর্বক চিকিত্সা গ্রহণ করলে ফ্যাটি লিভার
ডিজিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায়। যদিও ফ্যাটি লিভারের রোগীদের অল্প সংখ্যকই
সিরোসিস পর্যায়ে যায় তথাপি যার সিরোসিস হবে সেই হতভাগা ব্যক্তি যে আপনি বা
আমিই হবো না তার নিশ্চয়তা কি? এজন্য কোন ব্যক্তির যদি ঘটনাক্রমে ফ্যাটি
লিভার ডিজিজ ধরা পড়ে তার উচিত্ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে লিভার বিশেষজ্ঞ
ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা। সময়ের সাথে সাথে মানুষের যেমন ফ্যাটি লিভার
ডিজিজ বাড়ছে তেমনি এর ক্ষতি, প্রতিকার এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে সামাজিক
সচেতনতা তৈরী করা গেলে উক্ত রোগ থেকে মুক্ত হওয়া বা উক্ত রোগকে প্রতিরোধ
করাও সম্ভব।
ডায়রিয়া বাংলাদেশের মানুষের একটি সাধারণ রোগ। এর
অন্যতম প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে
বসবাস। ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ডায়রিয়া সেড়ে যাওয়ার
কিছুদিন পর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, পেটের ডান দিকে বুকের নিচে ব্যথা ইত্যাদি
উপসর্গ দেখা দেয়। ডাক্তাররা এদেরকে লিভার অ্যাবসেসের রোগী হিসাবে চিহ্নিত
করেন। পেটের আলট্রাসনোগ্রাফিতে এদের লিভারে অ্যাবসেস নিশ্চিত হয়। লিভার
অ্যঅবসেস উপযুক্ত চিকিত্সা পেলে সম্পূর্ণ ভালো হয়। লিভার সেন্টারের একটি
গবেষণায় দেখা গেছে এখানে চিকিত্সা নিতে আসা ০.৭ শতাংশ রোগীর লিভারে
অ্যাবসেস পাওয়া গেছে।
উপরের পেটে ডান দিকে ও বুকের নিচে ব্যথার
আরও অনেক কারণে হতে পারে। তন্মধ্যে অন্যতম কয়েকটি কারণ হলো- পিত্তথলীর
প্রদাহ, পিত্তথলীতে বা পিত্তনালীতে পাথর, সরল লিভার সিস্ট ও হাইডাটিড
সিস্ট। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু ফকির কবিরাজ আছে যারা রোগ িনর্ণয়ের নামে
এই সকল রোগীর শরীরের বিভিন্ন ধরণের ক্ষতি সৃষ্টি করেন। এরকম একটি ঘটনা
ঘটেছে পিরোজপুরের একটি লোকের সাথে।
মকবুল আহমেদ পিরোজপুরের একজন
কৃষক। বয়স ৫০। তিনি হঠাত্ উপরোক্ত ধরণের পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হলে এলাকার
লোকের কাছে শুনতে পান যে একজন ফকির আছে যে পেটে ধরেই বলে দিতে পারে পেটে
কি সমস্যা আছে। উক্ত ফকিরের স্বরণাপন্ন হলে সে মকবুল আহমেদের পেটে ধরে বলে
যে, তার পেটে পাথর হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়ে একজন উত্সাহী চিকিত্সক
তা যাচাই করতে একটি বুদ্ধি করেন। তিনি একজন রোগী যার সত্যই পিত্তথলীতে
পাথর হয়েছে তাকে উক্ত ফকিরের কাছে প্রেরণ করেন। উক্ত ফকির এবার রোগ ধরতে
ব্যর্থ হয় এবং বলে যে তার পেটে কোন সমস্যা নেই। পরে এলাকার লোক তার ভন্ডামি
ধরতে পেরে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।
এভাবেই গ্রাম বাংলার সাধারণ
মানুষদের বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ করে চলেছে একদল ধান্দাবাজ লোক। যারা ফকির
কবিরাজ সেজে মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে, অত:পর তাদের চিকিত্সা করার নামে
উল্টো সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। লক্ষ্যনীয় আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে
যে লিভার রোগ সম্পর্কে এখনও যতেষ্ট সচেতনতার ঘাটতি আছে তা এখান থেকে আবারও
উপলব্ধি করা যায়। এই ঘাটতি পূরণ করতে এগিয়ে আসতে হলে আমাদের চিকিত্সক
সমাজকে সর্বপ্রথম এই সম্পর্কে অবহিত এবং প্রশিক্ষিত করতে হবে। বাংলাদেশে
লিভার রোগকে পৃথকভাবে বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবি মেডিক্যাল
ইউনিভার্সিটিতে হেপাটোলজি বিভাগ খোলা হয় ১৯৮৩ সালের মে মাসে। এরপর ধীরে
ধীরে এই বিভাগের অধীনে উল্লেখযোগ্য সংখ্য চিকিত্সক লিভার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ
হয়ে বের হয়েছে। হেপাটোলজি সোসাইটি বাংলাদেশ কর্তৃক গত কয়েক বছর ধরে
বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ ডাক্তারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লিভার রোগের
গবেষণা ও আধুনিক চিকিত্সার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করতে জাতীয় ও
আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করে আসছে। আন্তর্জাতিক কনফারেন্সগুলোতে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথিতযশা চিকিত্সকগণ লিভার সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে
বক্তব্য রাখেন। এতে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন পোস্টগ্রাজুয়েশন করা বরেণ্য
চিকিত্সকগণ। এছাড়া হেপাটোলজি সোসাইটি বাংলাদেশ জেনারেল প্রাকটিশনার নিয়েও
সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের আয়োজন করেছে। এ হিসেবে বাংলাদেশের
চিকিত্সকদের লিভার রোগকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখার বিষয়ে উদ্ধুদ্ধ করতে এটি
বেশ বড় পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি টেলিভিশন মিডিয়ার বিভিন্ন প্রোগ্রাম,
সংবাদপত্রে লিখিত সচেতনতামূলক প্রবন্ধ ও ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস ডে’-তে প্রেস
কনফারেন্স করার মাধ্যমে হেপাটোলজি সোসাইটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে
লিভার রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে দিতে কাজ করে
যাচ্ছে।
আমরা আশা করি, বাংলাদেশের সকল চিকিত্সকগণ ও সচেতন
নাগরিকগণও ভূয়া চিকিত্সক ও ভন্ড কবিরাজ-ফকিরের কাছে থেকে সাধারণ মানুষকে
বাঁচাতে এবং যথাস্থানে গিয়ে লিভারের রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সাগ্রহণের
প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে সচেষ্ট হবেন। এভাবে একদিকে যেমন বাংলাদেশের
মানুষদের মাঝে লিভার রোগের একটি বড় অনির্ণীত অংশ যেমন নির্ণীত হবে তেমনি
লিভার রোগ প্রতিরোধ করে রোগের ব্যপ্তি কমাতেও তত্পর হওয়া যাবে।
লেখক:পরিচালক
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
ধানমন্ডি, ঢাকা